![]()
ব্রেন্ডন জুলিয়ানের কণ্ঠে বিস্ময়! সেটি অস্ট্রেলিয়ানদের ডেরায় গিয়ে বাংলাদেশ তাদের টেস্টে হারিয়ে দিয়েছে বলে নয়। এত বড় একটি জয়ের পর সফরকারী দলের খেলোয়াড়দের উদযাপনের যে ছবিটি নিশ্চিত দেখবেন বলে ধরে নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই অলরাউন্ডার, সেটি দেখতে না পাওয়াই তাঁর বিস্মিত হওয়ার কারণ! মমিনুল হকের স্কয়ার কাটে বাউন্ডারি পেরিয়ে যাওয়া জয়সূচক শটে ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ের তীরে নোঙর করতেই ড্রেসিংরুম থেকে ভোঁ-দৌড় দিয়ে দলের বাকি সবাই ছুটে যাবেন মাঝমাঠে—এমন কিছুই প্রত্যাশিত ছিল জুলিয়ানের।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথায় চিরকালের জন্য ঠাঁই করে নেওয়া জয়ের পর কাউকে সে রকম কিছু করতে না দেখেই আর বিস্ময়ের সীমা রইল না তাঁর।
জুলিয়ানের এই বিস্ময়ের গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বদলে যাওয়ার গল্প। একটা সময় টেস্ট জয়ের দেখা মিলত কালেভদ্রে। গত কয়েক বছরে সেই চিত্র বদলেছে; বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে।
এই সময়ে নিউজল্যান্ডকে তাদের মাঠে হারানোর মতো ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি ঘরে, ঘরের বাইরে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই, ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট জয় তো আছেই। তবু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের মহিমা যে অন্য রকম; সেটাও তাদের মাটিতে। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত যেমন বললেন, ‘এটা (সব সংস্করণ মিলিয়ে) বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা জয়।’ সেই জয়ের উদযাপনে মাঠে পরিমিতিবোধ প্রমাণ করে, ঝড়ে বক মরার মতো করে ধরা দেয়নি এই জয়।
টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির এই প্রকল্প ২০১৯ সালে অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর থেকেই শুরু করেছিলেন মমিনুল হক। ডারউইনে তাঁর ব্যাটেই জয়সূচক রান সেই ধারার পূর্ণতাও বলা যায়। ক্রমান্বয়ে সেটির এখন সর্বোচ্চ উচ্চতায় আছেন নাজমুল। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে সর্বোচ্চ ৯টি টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ।
নাজমুলই দলের মধ্যে বিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের (সিএ) বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অল আউট হওয়ার পরও।
টেস্টপূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও দলের প্রতি বিশ্বাসের বার্তা ছিল নাজমুলের। টেস্টের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ দলের শরীরী ভাষায়ও ছিল আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি। শুরু থেকে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার মানসিকতা নিয়ে নামার কথা উঠে এসেছে ম্যাচসেরা হাসান মাহমুদের কথায়ও।
প্রথম দুই দিনের দাপুটে ক্রিকেটের পর তৃতীয় দিনই মূলত জয়ের সুবাস পেয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করা অজিরা তখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ৬৭ রানে পিছিয়ে। হাতে ছিল ৬ উইকেট। সবচেয়ে বড় বাধা ট্রাভিস হেড ও স্টিভ স্মিথ আউট হয়ে গিয়েছিলেন সেদিনই। তবু গতকাল চতুর্থ দিন নিয়ে নাজমুল, মেহেদী হাসান মিরাজদের কণ্ঠে ছিল সতর্কবার্তা। অতি আত্মবিশ্বাসী না হওয়ার ভাবনা থেকেই হয়তো এমনটা। অবশ্য ক্যামেরন গ্রিন আর অ্যালেক্স ক্যারির জুটিটাও মোটামুটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে বড় একটা জুটিই বদলে দিতে পারত ম্যাচের পরিস্থিতি। সেই সুযোগ দিলেন না মিরাজ। দুই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারের জুটিতে বাংলাদেশ দলের ধৈর্যচুতি ঘটার আগেই ক্যারিকে উইকেটকিপার লিটন দাসের ক্যাচ বানান এই অফস্পিনার। চতুর্থ-পঞ্চম দিন ডারউইনে স্পিনাররা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেন, এমন আওয়াজ তো আগে থেকে ছিলই। সেটাই মিরাজ নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে যেটুকু অনিশ্চয়তা ছিল, তা-ও দূরে করে দেন। ক্যারির পর তাঁর শিকারের তালিকায় যুক্ত হন বাও ওয়েবেস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়ন। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ফাইফারের পর দ্বিতীয় ইনিংসে নেন মিরাজ। মাঝে গলার কাঁটা হয়ে আটকে থাকা গ্রিনকে ফেরান হাসানই। আউটের আগে অবশ্য ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করে যান গ্রিন (১০৪)। তাতে অস্ট্রেলিয়ানদের দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭ রান। মামুলি সেই লক্ষ্য তাড়ায় শুরুতেই আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিমের উইকেট সাময়িক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল ম্যাচে। তবে সাদমান ইসলাম ও মমিনুল তা বাড়তে দেননি। দুজনের অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটিতে ডারউইনে লেখা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের অমর এক অধ্যায়।
বাংলাদেশের এমন অর্জনের মুহূর্তে কিশোরগঞ্জের পথে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যাত্রাপথেই ভিডিও কলে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে অভিনন্দন জানান তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকেও দলের খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন, ‘দেশে সবাই আপনাদের অপেক্ষায় আছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের মাটিতে এই ঐতিহাসিক জয় দেশের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।’ ক্রিকেটারদের সবার স্বাস্থ্যের খোঁজখবরও নেন প্রধানমন্ত্রী। ভিডিও ফোনালাপে ডারউইন টেস্টের দুই নায়ক হাসান ও তানজিদ হাসান তামিমের সঙ্গে আলাদা কথা বলেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বলেন, ‘ভাইয়া (প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করে), তানজিদ তো বগুড়ার ছেলে; ১০০ করছে।’ তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বগুড়ার নয়, ও বাংলাদেশের ছেলে; বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।’ পরে বিসিবি কার্যালয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন তামিম নিজেও। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়কে বিশ্বের কাছে বার্তা হিসেবে দেখছেন তিনি, ‘এই জয়টি বিশ্বের কাছে একটি বার্তা। বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সম্ভবত এটি সবচেয়ে বড় জয়। আমরা সবাই এই অর্জনে সমানভাবে খুশি। আমি অত্যন্ত গর্বিত।’ সবার গর্বের এই জয়ে লেখা থাকবে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে উইকেটের হিসাবে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা টেস্ট জিতল বাংলাদেশ। এর আগেরটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে ১০ উইকেটের ব্যবধানে। ভারত বাদে এশিয়ার কোনো দল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিতল ৩১ বছর পর। টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেও কি এসব ভাবনায় ছিল? গল্প মনে হওয়া বিষয়টিই এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর রূপকথা!
বাংলাদেশ সময়: ১:৫৪:০১ ৭৩ বার পঠিত |