
বরগুনা সদর উপজেলার লতাকাটা খেয়াঘাট এলাকার জেলে মোহাম্মদ ফিরোজ। ছোটকাল থেকে বাড়ির কাছের পায়রা নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল না পেয়ে দীর্ঘদিন মাছ ধরতে না পেরে এবং সমুদ্রে মাছ ধরায় সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় চরম অর্থ সংকটে পড়েছেন তিনি।
ফিরোজের অভিযোগ, এবারের সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের যতোটা অর্থ সংকটে ভুগতে হচ্ছে এতোটা আগে ভুগতে হয়নি। কারণ প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞার আগে বেশি করে মাছ ধরে নিষেধাজ্ঞার সময়ের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে পারলেও তেল সংকটে এবার তারা সেটা পারেননি। অপরদিকে সরকার জেলেদের জন্য ৭৭ কেজি করে চাল দিলেও তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ কেজি।
তিনি
বলেন, সরকার থেকে আমাদের জন্য চাল বরাদ্দ হয়েছে ৮০ কেজি, আমি পেয়েছি মাত্র ৩০ কেজি। বাকিটা মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং তাদের চামচারা খেয়ে ফেলেছে। সরকার যদি এভাবে চাল না দিয়ে জেলে কার্ডের আলোকে আমাদের সরাসরি টাকা দিতো তাহলে মাঝখানে কেউ আমাদেরটা মেরে খেতে পারতো না।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে গত ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরায় চলছে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। প্রতি বছর এই নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই নিষিদ্ধ সময়ের অর্থনৈতিক প্রস্তুতি নেন জেলেরা। কিন্তু জ্বালানি সংকটে পর্যাপ্ত মাছ ধরতে না পারায় এবার আগাম প্রস্তুতি নিতে পারেননি উপকূলের মৎস্য শিকারিরা। ফলে তাদের জীবন এখন সংকটে কাটছে বলে অভিযোগ ওই এলাকার প্রায় সব জেলের।
সমুদ্রে যেতে না পারা এই জেলেরা বলছেন, আগে সমুদ্রে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে মাছ ধরে কিছুটা চলা গেলেও জেলার তালতলীতে পায়রা নদীর পাড়ে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের পর মাছ মিলছে না নদীতেও। যা আরও প্রকট আকারে নিয়েছে তাদের সংকটকে।
সোহেল নামে আরও একজন জেলে বলেন, মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে সরকার যে চাল দেয় সেটা যদি সঠিকভাবে পেতাম তাহলে শাক সবজি সংগ্রহ করে পরিবার পরিজনকে খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু সরকার দেয় ৮০ কেজি আমরা পাই ৪০ কেজি। এভাবে হলে আমরা কিভাবে বাঁচবো। আমরাতো আর কিছু করতেও পারি না।
সুজন মিয়া নামে আরেকজন জেলে বলেন, আগের বছরগুলোতে নিষিদ্ধ সময় শুরু হওয়ার আগেই আমরা কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখতাম। কিন্তু এবারতো যুদ্ধের কারণে তেল না পাওয়ায় সমুদ্রে নামতেই পারিনি। একেতো তেল পাওয়াই যায় না, পেলেও ১০০ টাকার তেল কিনতে হয়েছে ১৫০ টাকা করে। এই বাড়তি টাকা বহন করতে গিয়ে আমরা আর সঞ্চয় করতে পারিনি। এখন খুব কষ্টে আমাদের দিন কাটছে।
আরেকজন বলেন, আগে সমুদ্রে না গেলে আমরা নদীতে মাছ ধরতে পারতাম। কিন্তু এখন পায়রা নদীর মুখে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর থেকে নদীতেও মাছ পাই না। কারণ ওরা সমুদ্র থেকে নদীতে মাছেদের ঢোকার স্থানেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দূষিত পানি ছেড়ে দেয়। এভাবে মাছ না পেতে পেতে ঋণে জর্জরিত হয়ে আমরা কেউ বড় বোটের কর্মচারি হয়ে যাচ্ছি, কেউ আবার টিকতে না পেরে অন্য কোথাও চলে গিয়ে অন্য পেশা খুঁজতেছি।
জেলেদের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, নিষিদ্ধ সময়ের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা, নদীতে মাছের আকাল এবং অবৈধ জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে প্রান্তিক জেলেরা তাদের স্বাধীন পেশা হারিয়ে বড় বড় ট্রলারের শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। তাই মাছ ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নিষেধাজ্ঞা পালনে জোর দেওয়ার পাশাপাশি নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জীবন জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করণের পরামর্শ তাদের।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরাতো সমুদ্র বা নদীর মাছদের খাবার দেই না। নদীতে থাকা ফাইটোপ্লাংকটন ও জু-প্লাংকটনই এসব মাছের খাবার হয়। স্বাভাবিকভাবে যেখানে খাবার থাকবে মাছতো সেখানেই যাবে। কিন্তু এই নদীর মুখে পানির গুণগত মান ঠিক না থাকলে মাছ আসবে কিভাবে? একারণেই এই নদীতে মাছ কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, উপকূলের মানুষ এমনিতেই ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। তাদের প্রতিনিয়ত জলবায়ুর সঙ্গে লড়তে হয়। তার মধ্যে সরকার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে নদীর মুখে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে পুরো জেলে সমাজকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। আমরা মনে করি নতুন সরকারের এ বিষয়ে এখনি তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, জেলেদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে নদীতে যেমন মাছ আসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে একইসঙ্গে মাছ সংরক্ষণে সরকারের দেওয়া নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের ক্ষতিপূরণ যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি এই ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত হচ্ছে। এমনটা চললে জেলেরা পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হলে আমাদের চরম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।
ধরীত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সদস্য সচিব ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অধিকার কর্মী শরিফ জামিল বলেন, বরগুনার তালতলীতে নির্মিত বরিশাল ৩৫০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আহামরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না যে, তার জন্য এত বড় জনগোষ্ঠীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে হবে। এখানে মাত্র ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, সেটাও নিয়মিত না। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরো নদী দখল করে নির্মাণ করা হয়েছিল। তাই আমরা মনে করি সরকার এ বিষয়ে এখনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ করে সেখানে প্রয়োজনে সৌর শক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
বরাদ্দের চাল কম দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীন বাংলাভিশনকে বলেন, সরকারিভাবে আমরা ৭৭ কেজি করেই সকল নিবন্ধিত জেলের জন্য দিয়েছি। এই চাল স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিতরণ হয়ে থাকে। কাউকে এক কেজিও কম দেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ কম দিয়ে থাকলে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:২২:১৩ ২৯ বার পঠিত |