
জাতীয় ঐক্য, কার্যকর সংসদ এবং গণতন্ত্র রক্ষায় সব দলের সমন্বিত ভূমিকা চেয়ে সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেছেন, আমরা কেউ মরতে চাই না, সবাই মিলে বাঁচতে চাই—দেশকে বাঁচিয়ে তারপর বাঁচতে চাই, এই দর্শন নিয়েই বর্তমান সংসদকে এগিয়ে যেতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
অতীতের দুঃসময়ের কথা স্মরণ করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা-হামলা ও দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা নিয়েই বর্তমান সংসদের অনেক সদস্য এখানে এসেছেন। এ সংসদ মজলুমদের সংসদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বারবার সংকট, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। দুর্ভিক্ষ, গণতন্ত্রহীনতা ও স্বৈরশাসনের সময় অতিক্রম করে দেশ আজকের অবস্থানে এসেছে।
নূরুল ইসলাম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, স্বাধীনতার আগে মানুষের স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র, বৈষম্যহীন সমাজ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়া। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেই স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হলেও স্বাধীনতার পর নানা দমন-পীড়ন, রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক সংকট দেশকে হতাশার দিকে নিয়ে যায়।
বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোও সীমিত হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চিফ হুইপ বলেন, পরে জিয়াউর রহমান নেতৃত্ব দিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উৎপাদনমুখী নীতি চালুর মাধ্যমে দেশকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তার মৃত্যুর পর আবার অস্থিরতা তৈরি হলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন জোরদার হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বারবার সংকট, স্বৈরশাসন ও অন্ধকার সময় পার করে এগিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও নির্যাতন, গুম, বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, এসব চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন আবার একটি ‘নতুন সূর্যোদয়ের’ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি সব পক্ষকে বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের আহ্বান জানান।
তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, দল-মত ভিন্ন হলেও একটি ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম ও মানবিক বাংলাদেশ’ গঠনে সবার ঐক্য থাকা উচিত। একইসঙ্গে তিনি বিরোধীদলের বক্তব্যের প্রশংসা করে বলেন, কার্যকর সংসদ গঠনে অতীতের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
সংসদকে প্রাণবন্ত করার আগে কার্যকর করা জরুরি উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, ‘সংসদ যদি কার্যকর না হয়, তাহলে শুধু প্রাণবন্ত হলেই লাভ নেই।’ জাতীয় সমস্যাগুলো সংসদে এনে যুক্তিসঙ্গত সমাধানের চেষ্টা করার আহ্বান জানান তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, জ্বালানি ও গ্যাস ইস্যুতে সংসদে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার ফলে জনমনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি জানান, সরকার ও সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত সুবিধা ত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ‘প্লট নেব না, গাড়ি নেব না—এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, জাতির স্বার্থে,’ বলেন তিনি।
সংসদের সাম্প্রতিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি জানান, স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক আইন ও অধ্যাদেশ নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আমরা কাজ করেছি, যা একটি রেকর্ড।’ তবে দ্রুততার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল স্বীকার করে তিনি বিরোধীদলের সদস্যদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিলগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে উপস্থাপন করা হবে।
চিফ হুইপ তার বক্তব্যে গ্রামীণ জনগণ, শ্রমজীবী মানুষ ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি হবে মানুষের জন্য—যে কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক প্রতিদিন সংগ্রাম করে বাঁচে, তাদের জীবনমান উন্নয়নই গণতন্ত্রের আসল লক্ষ্য।’
তিনি সব দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে—আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
বাংলাদেশ সময়: ২২:৪৬:৪৯ ৩৩ বার পঠিত |